কনসার্ট বাতিলের পটভূমি
দুই দিনের ব্যবধানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল এমন কনসার্টগুলো হঠাৎ বাতিল হয়ে যায়। এই ঘটনাগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও দেখা গিয়েছিল, কিন্তু নির্বাচিত সরকারের অধীনে আবারও একই পরিস্থিতি দেখা দেওয়ায় সাংস্কৃতিক অঙ্গনে উদ্বেগ বাড়ছে।
শিল্পীদের বক্তব্য
শেখ সাদী খান বলেন, “আমরা একে অন্যকে খোঁচাখুঁচি করার রাজনীতি করছি। কিন্তু সবাই মিলে দেশের জন্য কীভাবে কিছু করা যায়, দেশটাকে কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়—সেই জায়গায় আমাদের চিন্তাভাবনা খুব একটা নেই। এই প্রবণতা বন্ধ হওয়া উচিত।” তিনি আরও যোগ করেন, “ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো সংগীতসমৃদ্ধ জেলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সেখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধের সাম্প্রতিক ঘটনাটি পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।”
সাবিনা ইয়াসমীনও উল্লেখ করেন, “শিল্পী, যন্ত্রশিল্পী, আয়োজকসহ সংশ্লিষ্ট সবারই আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। গান কিংবা কোনো অনুষ্ঠান কারও পছন্দ না হলে সেটি না দেখার অধিকার তাঁর অবশ্যই আছে, কিন্তু পছন্দ নয় বলে একটি অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।” তিনি বলেন, “সরকারের কোনো সংস্থার যদি কোনো অনুষ্ঠান নিয়ে আপত্তি থাকে, তাহলে সেটি শুরুতেই জানানো উচিত।”
হামিন আহমেদ বলেন, “কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এ ধরনের পরিস্থিতি এক-দুই মাসে তৈরি হয়নি। গত কয়েক বছরে ধীরে ধীরে বিষয়টি বড় আকার ধারণ করেছে। তাই এখনই এর লাগাম টেনে ধরা প্রয়োজন।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, “পুলিশ, থানা বা জেলা প্রশাসন যদি কোনো এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তাহলে সেই থানা কীভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করছে—সেই প্রশ্নও তুলতে হবে।”
বেবী নাজনীন বলেন, “কনসার্ট বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনা বারবার ঘটতে থাকলে শিল্পীরা নিরুৎসাহিত হবেন। উগ্র গোষ্ঠীগুলোর উদ্দেশ্য হয়তো সেটিই—শিল্পীদের ভয় দেখানো, নিরুৎসাহিত করা এবং একদিন তাদের কাজ বন্ধ করে দেওয়া।” তিনি বলেন, “সাংস্কৃতিক চর্চা নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাওয়ার জন্য সরকার ও তার সংস্থাগুলোর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি।”
নাজমুন মুনিরা ন্যান্সিকও যোগ করেন, “কোনো একটি গোষ্ঠী আপত্তি করলে তার কারণে প্রশাসন অনুষ্ঠান বাতিল করে দিল—এমনটা হতে পারে না। এটি সরাসরি সংস্কৃতির ওপর হুমকি।” তিনি বলেন, “প্রশাসনের বড় ভূমিকা রয়েছে, বৈধ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়ে আপত্তি থাকলে তার যৌক্তিকতা যাচাই করতে হবে।”
সরকারের প্রতি অনুরোধ
শিল্পীরা সরকারকে অনুরোধ করেছেন, “কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর দ্রুত, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে এবং তদন্তের ভিত্তিতে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।” তারা আরও বলেন, “সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে কেউ যেন কোনো ধরনের ব্যাঘাত ঘটাতে না পারে। আর যারা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে—সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এমন একটি স্পষ্ট বার্তা আসা দরকার।”
শেখ সাদী খান বলেন, “সাংস্কৃতিক বলয়টাই যদি নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে রাজনীতিও নষ্ট হয়ে যাবে। সংস্কৃতি ও রাজনীতির মধ্যে সুন্দর সমন্বয় থাকা জরুরি।” তিনি যোগ করেন, “আমাদের দেশ আমাদের সবার। আমাদের একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। গান-বাজনা এ দেশের মানুষের রক্তে, মগজে, মননে মিশে আছে।”
উপসংহার
শিল্পীরা জোর দিয়ে বলেন, “সাংস্কৃতিক চর্চা নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাওয়ার জন্য সরকারকে একটি নিরাপদ ও সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো গোষ্ঠী আপত্তি করলেই বা হুমকি দিলেই প্রশাসনের দায়িত্ব অনুষ্ঠান বাতিল করা নয়, বরং নিরাপত্তা নিশ্চিত করে অনুষ্ঠানটি নির্বিঘ্নে করানো।”
Source: prothom alo







