DPDC's revenue theft epic

• প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা ভ্যাট ফাঁকির চাঞ্চল্যকর নথিপত্র ফাঁস
• গ্রাহক থেকে সংগ্রহ করলেও জমা হয়নি এনবিআরের কোষাগারে
• সুশাসনের অভাব ও নৈতিক অবক্ষয়ের এক করুণ দলিল
• আর্থিক অসংগতি ও জবাবদিহিহীনতার এক নির্লজ্জ বহিঃপ্রকাশ
হাসান মাহমুদ রিপন :
আলোর ফেরিওয়ালা হিসেবে পরিচিত রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)। রাজধানী ও তৎসংলগ্ন জনপদের অলিগলি আলোকিত করার গুরুদায়িত্ব যাদের কাঁধে, সেই প্রতিষ্ঠানের অন্ধকার গলিতেই এখন ধরা পড়েছে রাষ্ট্রীয় কোষাগার লুন্ঠনের চাঞ্চল্যকর সব আখ্যান। সাধারণ গ্রাহকের পকেট থেকে বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে আদায় করা ভ্যাট সরকারি তহবিলে জমা না দিয়ে রীতিমতো তেলেসমাতি কারবার চালিয়েছে সংস্থাটি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ) নিখুঁত অনুসন্ধান ও নিবিড় পর্যবেক্ষণে উন্মোচিত হয়েছে প্রায় ৪১ কোটি ২৬ লাখ টাকার ভ্যাট জালিয়াতির এক বিষ্ময়কর চিত্র। এটি কেবল সংখ্যার হিসাব নয়, বরং দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের চরমতম আর্থিক অসংগতি ও জবাবদিহিহীনতার এক নির্লজ্জ বহিঃপ্রকাশ।
তদন্তের আড়ালে লুকানো অসংগতি:
২০২৫ সালের এপ্রিলের শেষভাগে এলটিইউ-এর অভিজ্ঞ নিরীক্ষাদল ডিপিডিসির ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত দীর্ঘ তিন বছরের আয়-ব্যয়ের খতিয়ান তল্লাশি শুরু করে। সিএ রিপোর্ট, মাসিক ভ্যাট রিটার্ন এবং অভ্যন্তরীণ দালিলিক প্রমাণাদি খুঁটিয়ে দেখতে গিয়েই বেরিয়ে আসে প্রকৃত সত্য। নিরীক্ষক দল অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করেন, প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বার্ষিক প্রতিবেদন এবং ভ্যাট রিটার্নের তথ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। ক্যাশ ফ্লো স্টেটমেন্টে গ্রাহকের কাছ থেকে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহের কথা উল্লেখ রয়েছে, সরকারি খাতায় তার প্রতিফলন ঘটানো হয়েছে অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে। প্রায় ৭৩০ কোটি টাকার বিদ্যুৎ বিক্রির তথ্য সরাসরি গোপন করা হয়েছে, যা ভ্যাট আইনের চরম লঙ্ঘন।
জালিয়াতির আদ্যোপান্ত:
তদন্তের সূত্রপাত হয় ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল। এলটিইউ কর্তৃক গঠিত একটি বিশেষ নিরীক্ষাদল ডিপিডিসির ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত প্রতিটি নথিপত্র তন্ন তন্ন করে তল্লাশি চালায়। অডিট দল যখন বার্ষিক প্রতিবেদন (সিএ রিপোর্ট), মাসিক দাখিলপত্র (ভ্যাট রিটার্ন) এবং ভ্যাট সংক্রান্ত আনুষঙ্গিক তথ্যাদি একে অপরের সঙ্গে মেলাতে শুরু করে, তখনই বেরিয়ে আসে শুভঙ্করের ফাঁকি।
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, সিএ রিপোর্টে বর্ণিত ‘ক্যাশ কালেকশন ফ্রম কনজ্যুমার’ বা গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগৃহীত প্রকৃত অর্থের অংক এবং ভ্যাট রিটার্নে প্রদর্শিত বিক্রয়মূল্যের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য বিদ্যমান।
২০২২-২৩ অর্থবছর: বিক্রয়মূল্য দেখানো হয়েছে ৮ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা, যেখানে সিএ রিপোর্টে সংগৃহীত অর্থ ৮ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা।
২০২৩-২৪ অর্থবছর: ১০ হাজার ৩২০ কোটি টাকা বিক্রয়মূল্য হিসেবে প্রদর্শিত হলেও সিএ রিপোর্ট বলছে ১০ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছর: চিত্রটি বিপরীতমুখী; এখানে বিক্রয়মূল্যের তুলনায় সিএ রিপোর্টে অধিক সংগৃহীত অর্থ (১১ হাজার ২২৭ কোটি টাকা) দেখা গেছে।
এই গরমিল থেকেই স্পষ্ট হয় যে, ডিপিডিসি সুপরিকল্পিতভাবে বিক্রয় তথ্যে কারসাজি করেছে। অডিট দল নিশ্চিত হয়েছে যে, তিন বছরে প্রায় ৭৩০ কোটি ১১ লাখ ৩৯ হাজার ৭২৯ টাকা বিদ্যুৎ বিক্রির তথ্য রিটার্নে গোপন করা হয়েছে। এই লুকানো বিক্রয়মূল্যের ওপর ৫ শতাংশ হারে ৩৬ কোটি ৫০ লাখ ৫৬ হাজার ৯৮৬ টাকা ভ্যাট রাষ্ট্রের প্রাপ্য, যা কখনোই সরকারি ভাণ্ডারে পৌঁছায়নি।
অপারেটিং ইনকামেও কারচুপির খেলা
বিদ্যুৎ বিক্রির পাশাপাশি ‘আদার অপারেটিং ইনকাম’ খাতেও চলেছে চরম অনিয়ম। সিএ রিপোর্ট ও দাখিলপত্রের অসংগতি বলছে, এই খাতে ১৫ কোটি ৫১ লাখ ৬৫ হাজার ৭৬১ টাকা কম দেখানো হয়েছে। এর ওপর ১৫ শতাংশ হারে ২ কোটি ৩২ লাখ ৭৪ হাজার ৮৬৪ টাকা ভ্যাট পরিশোধ না করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি এক নতুন কৌশল অবলম্বন করেছে। ভ্যাট আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বা কেনাকাটার ওপর যে ‘উৎসে মূসক’ বা ‘উইথহোল্ডিং ভ্যাট’ কর্তন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেখানেও ঘটেছে ব্যর্থতা। মোট ২৬২ কোটি ৪৪ লাখ ৪৯ হাজার ৫৯৯ টাকা উৎসে কর প্রযোজ্য হলেও, ডিপিডিসি ২ কোটি ৪২ লাখ ৮২ হাজার ৪৪৪ টাকা সরকারি তহবিলে জমা দিতে অবহেলা করেছে।
ভ্যাট ফাঁকির অশুভ প্রবণতা
বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ডিপিডিসিকে তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয় ও সেবাপ্রাপ্তির বিপরীতে উৎসে ভ্যাট বা মুসক কর্তন করতে হয়। কিন্তু আইনের অনুশাসন মেনে চলার পরিবর্তে তারা বেছে নিয়েছে দায়সারা গোছের পথ। বিগত তিন বছরে ২৬২ কোটি ৪৪ লাখ টাকার উৎসে ভ্যাট প্রযোজ্য থাকলেও, সেখানে প্রায় ২ কোটি ৪২ লাখ টাকার কোনো হদিস মিলছে না। অর্থাৎ, সরকারি অর্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পরিবর্তে নিজেদের তহবিল সমৃদ্ধ করার এই প্রচেষ্টায় ডিপিডিসির নৈতিক স্খলন স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
ডিপিডিসির এই ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয়, বরং দেশের বিদ্যুৎ খাতে সুশাসনের অভাবের এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত যখন ভর্তুকির ভারে নুইয়ে পড়ছে, তখন রাজস্ব আদায়ের এমন বেপরোয়া জালিয়াতি দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে বাধাগ্রস্ত করবে।
অডিট বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন:
১. ডিপিডিসির প্রতিটি আর্থিক লেনদেনে ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা।
২. অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৩. প্রতি তিন মাস অন্তর এলটিইউ কর্তৃক নিরপেক্ষ তদারকি নিশ্চিত করা।
স্বচ্ছতার অভাব ও নীতিনির্ধারকদের নীরবতা
সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাবিবুন নাহার কিংবা নির্বাহী পরিচালক (অর্থ) মোহাম্মদ হায়দার আলীর মতো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের একাধিক প্রচেষ্টা চালানো হলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি। হোয়াটসঅ্যাপের ডিজিটাল মেসেজগুলো তাদের মোবাইল স্ক্রিনে উজ্জ্বল হলেও, জবাবদিহিতার আলো সেখানে পৌঁছায়নি। নীরবতা কি অপরাধ স্বীকারোক্তি? নাকি ক্ষমতার দাপটে তথ্য লুকানোর এক চিরাচরিত সংস্কৃতি? এ প্রশ্ন আজ জনমনে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি কেবল সাধারণ অনিয়ম নয়, বরং গ্রাহক-প্রতারণা। ভ্যাট আইন অনুযায়ী, ফাঁকি প্রমাণিত হলে দাবিনামার অতিরিক্ত হিসেবে বিশাল অংকের জরিমানা আরোপের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা ও জনদাবি
বিদ্যুৎ এমন একটি পরিষেবা, যার প্রতিটি ইউনিটের বিপরীতে গ্রাহক নির্দিষ্ট হারে ভ্যাট পরিশোধ করেন। অর্থাৎ, ডিপিডিসি কেবল মধ্যস্থতাকারী হিসেবে এনবিআর ও ভোক্তার মাঝে সেতুবন্ধন তৈরির কথা ছিল। কিন্তু সেই বিশ্বাস ভেঙে যখন অর্থ তসরুফ হয়, তখন তা সমগ্র কর কাঠামোকেই প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয়। এলটিইউ কর্তৃক জারি করা কারণ দর্শানো নোটিশ এখন ডিপিডিসির জন্য অগ্নিপরীক্ষার সমান। প্রমাণ দেখাতে ব্যর্থ হলে কেবল বকেয়া ভ্যাটই নয়, গুনতে হবে দণ্ড।
আইনি জটিলতা ও ভবিষ্যতের শঙ্কা
এনবিআরের এলটিইউ ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করেছে। আইন অনুযায়ী, এই নোটিশের জবাব দিয়ে ডিপিডিসিকে তাদের দাবিনামাকৃত ভ্যাটের স্বপক্ষে প্রমাণ হাজির করতে হবে। যদি তারা তা দেখাতে ব্যর্থ হয়, তবে কেবল মূল ভ্যাটই নয়, বরং আইন অনুযায়ী বিশাল অংকের জরিমানার কবলে পড়তে হবে এই সরকারি কোম্পানিকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বিদ্যুৎ খাতের মতো অপরিহার্য সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান যখন রাজস্ব ফাঁকিতে জড়িয়ে পড়ে, তখন তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। এটি কেবল নিয়ম লঙ্ঘন নয়, এটি রাষ্ট্রীয় আস্থার চরম অবমাননা।”
বিশেষজ্ঞ মতামত
অর্থনীতিবিদদের মতে, ডিপিডিসির মতো একটি জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এমন জালিয়াতি রাষ্ট্রীয় অডিট প্রক্রিয়ার দুর্বলতাকে প্রকট করে তোলে। সরকারি প্রকল্পের হাজারো কোটি টাকা ব্যয় করার সময় যদি ভ্যাট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা না থাকে, তবে জনস্বার্থ ব্যাহত হওয়াটাই স্বাভাবিক। বর্তমান সময়ে যখন জাতীয় অর্থনীতি নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠানের এহেন আচরণ রীতিমতো অপ্রত্যাশিত। এই ঘটনাটি বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান বিশৃঙ্খলার একটি লক্ষণ মাত্র। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি সংস্থাগুলো অভ্যন্তরীণ অডিট কিংবা জবাবদিহিতার আওতার বাইরে থেকে এভাবে দুর্নীতির সুযোগ নিচ্ছে। ডিপিডিসি—এর বিরুদ্ধে এমন এক চাঞ্চল্যকর অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, যা কেবল প্রশাসনিক গাফিলতি নয়, বরং রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের শামিল। যদি অবিলম্বে এ ধরনের জালিয়াতি রোধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের বড় অংশই গুটিকতক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার পকেটে চলে যাবে। এনবিআরের কঠোর অবস্থান প্রশংসার দাবি রাখে, তবে দাবি এখন কেবল ৪১ কোটি টাকা আদায় নয়; বরং এ ধরনের জালিয়াতি যেন ভবিষ্যতে আর পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা।
আলোর উৎস যখন অন্ধকারের আঁতুড়ঘরে পরিণত হয়, তখন তার দায়ভার সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিতেই হবে। ডিপিডিসির এই ভ্যাট ফাঁকির আখ্যান কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি সুশাসনের অভাব ও নৈতিক অবক্ষয়ের এক করুণ দলিল। সামগ্রিকভাবে, বিদ্যুতের বিল থেকে ভ্যাট কেটে রাখা এবং তা সরকারি তহবিলে না জমা দেওয়া—একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য চরম লজ্জার বিষয়। সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকা যখন লুটপাটের অলিগলিতে হারিয়ে যায়, তখন উন্নয়নের স্বপ্ন ফিকে হয়ে আসে। দেশের সাধারণ করদাতারা আশা করেন, আইন সবার জন্য সমান এবং যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের মুখোশ উন্মোচিত হবে। সরকারি অর্থের প্রতিটি পয়সা জনগণের আমানত, আর সেই আমানতের খেয়ানতকারীর ক্ষমা পাওয়ার কোনো অধিকার নেই। এখন দেখার বিষয়, এনবিআর শেষ পর্যন্ত কতটা দৃঢ়তার সঙ্গে এই জটিল অংকের ফয়সালা করতে পারে। ডিপিডিসি কি পারবে এই কালিমালিপ্ত অধ্যায় থেকে মুক্তি পেতে, নাকি তাদের ভাগ্যে নেমে আসবে কঠোর আইনি শাস্তি? এখন সেটাই দেখার অপেক্ষা।