মাওবাদীদের বিরুদ্ধে বিজেপি সরকারের এই ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ’ কেন

প্রকাশঃ

Spread the love

ভারতের ছত্তিশগড় রাজ্যে মাওবাদী বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে দেশটির কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার যে সামরিক অভিযান শুরু করেছে, তা কার্যত এক রণাঙ্গনে পরিণত হয়েছে। রাজ্যের করিগাট্টা পাহাড়ি জঙ্গলে মোতায়েন করা হয়েছে ১০ হাজারের বেশি সেনা। হেলিকপ্টারসহ তল্লাশি চলছে গভীর বনাঞ্চলে। ‘অপারেশন জিরো’ বা ‘অপারেশন কাগার’ নামে পরিচিত এই অভিযানকে মাওবাদী দমনের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এ অভিযান সরাসরি পরিচালনা করছে ভারতের ক্ষমতাসীন হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার। তারা ছত্তিশগড়ের রাজ্য সরকার ও কেন্দ্র—উভয় স্তরেই ক্ষমতায় রয়েছে। এ বছরের শুরু থেকেই সরকার মাওবাদীদের ওপর দমন–পীড়ন জোরদার করেছে। নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ২০১ জন বিদ্রোহী। নিহত ব্যক্তিদের অনেকেই আদিবাসী। শুধু গত বুধবারেই মারা গেছেন ২৭ জন, যাঁদের মধ্যে মাওবাদী সংগঠনের সর্বশেষ সাধারণ সম্পাদক নম্বালা কেশবা রাও রয়েছেন।

তবে মানবাধিকার সংগঠন ও বিরোধী দলগুলো এই অভিযানে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের অভিযোগ, ‘মাওবাদী’ আখ্যায় অনেক নিরীহ আদিবাসীকেও হত্যা করা হচ্ছে। তারা সরকারের কাছে যুদ্ধ বন্ধ করে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে।

সরকারি তথ্য অনুসারে, ২০০০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মাওবাদী সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন ১১ হাজারের বেশি মানুষ, যাঁদের মধ্যে রয়েছে সাধারণ মানুষ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও। এর মধ্যে নিহত বিদ্রোহীর সংখ্যা অন্তত ৬ হাজার ১৬০ জন।

মাওবাদীরা কারা, কী চায় তারা

ভারতে সশস্ত্র মাওবাদী আন্দোলনের সূচনা হয় ১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়িতে কৃষকদের এক বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে। এই ‘নকশাল’ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন চারু মজুমদার, কানু সান্যাল প্রমুখ। তাঁদের দাবি ছিল—ভূমিহীন কৃষকদের জমি দিতে হবে এবং জমিদারদের শোষণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

এই আন্দোলন থেকেই জন্ম নেয় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী), যারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে সশস্ত্র বিদ্রোহে বিশ্বাস করত। চীনা নেতা মাও সে–তুংয়ের বিপ্লবী দর্শন ছিল তাদের মূল অনুপ্রেরণা। তবে সময়ের সঙ্গে এই দল ভেঙে যায় বহু অংশে। মূল সিপিআই (এমএল) এখন একটি নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। তারা নির্বাচনে অংশ নেয়।

বিজেপির আগ্রাসী রণকৌশল

ছত্তিশগড়ে কংগ্রেস সরকার থাকাকালীন (২০২০-২০২৩) ১৪১ জন বিদ্রোহী নিহত হন। কিন্তু বিজেপি সরকার আসার পর ২০২৪ সালেই নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২২৩ জনে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বিষ্ণু দেব সাই বলছেন, ‘এখন চূড়ান্ত পর্ব চলছে, আমরা দ্রুত নকশালমুক্ত ভারতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।’

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও এই অভিযান ঘিরে নিয়মিত মাঠে যাচ্ছেন, সেনা শিবিরে রাত কাটাচ্ছেন। তাঁর ঘোষণা—২০২৬ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে ভারতকে ‘নকশালমুক্ত’ করে তোলা হবে।

বর্তমানে শুধু বস্তার অঞ্চলেই রয়েছে সরকারের ৩২০টি নিরাপত্তা শিবির। শিবিরগুলোতে সব মিলিয়ে আছে প্রায় ৩০ লাখ নিরাপত্তাকর্মী। গোটা ছত্তিশগড়ে মোতায়েন রয়েছে ৬৬ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী। ড্রোন, থার্মাল ইমেজিং, উপগ্রহ-নিরীক্ষণসহ নানা আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারি চলছে ঘন জঙ্গলে।

অভিযোগ: আদিবাসীদের ভুয়া এনকাউন্টারে হত্যা

তবে এ অভিযান নিয়ে সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে। ‘পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজ’-এর মতে, গত দেড় বছরে অন্তত ১১টি ভুয়া এনকাউন্টারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। যেমন মার্চে বিজাপুর জেলার বর্ডগা গ্রামে তিনজন বিদ্রোহীকে গুলি করে হত্যার দাবি করে পুলিশ। কিন্তু স্থানীয় লোকজন বলেন, ওই তিনজনকে রাতে তুলে নিয়ে গিয়ে পরে গুলি করে ‘মাওবাদী’ তকমা দেওয়া হয়।

২০১২ সালে সাড়েকে গুডা গ্রামে ১৭ আদিবাসী এবং ২০১৩ সালে ৮ জন আদিবাসী নিহত হন নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে। পরবর্তী তদন্তে উচ্চ আদালতের বিচারকেরা জানান, নিহত সবাই নিরপরাধ ছিলেন। অথচ আজও কোনো পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হয়নি।

মাওবাদীদের সক্ষমতা কি কমে আসছে

২০১১ সালে ছত্তিশগড়ের তৎকালীন পুলিশ মহাপরিদর্শক বিশ্বরঞ্জন অনুমান করেছিলেন যে বস্তার অঞ্চলে প্রায় ১০ হাজার সশস্ত্র মাওবাদী এবং ৪০ হাজার জন মিলিশিয়া সদস্য সক্রিয় ছিল। যদিও এই সংখ্যাগুলো নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা বেশ কঠিন। সেই সময় মাওবাদীরা নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর ভয়াবহ হামলা চালাতে সক্ষম ছিল। ২০১০ সালে তারা ছত্তিশগড়ের এক বনাঞ্চলে অতর্কিত হামলা চালিয়ে ৭৬ জন আধাসামরিক সদস্যকে হত্যা করে। তিন বছর পর আরেকটি হামলায় বহু মানুষ নিহত হন, যাঁদের মধ্যে কংগ্রেস নেতাও ছিলেন।

বর্তমানে বস্তারের আইজিপি সুন্দররাজ পি জানাচ্ছেন, এখন প্রায় এক হাজার সশস্ত্র মাওবাদী এবং তাদের সঙ্গে জড়িত আরও ১৫ হাজার ব্যক্তি সক্রিয় আছেন।

মাওবাদীদের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয়েছে যে তাদের সদস্য সংগ্রহ কমে গেছে। ইউনিটগুলো ছোট হয়ে গেছে এবং গোলাবারুদের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। একসময় যে কেন্দ্রীয় কমিটি ও পলিটব্যুরোতে ৪০ জন সদস্য ছিল, এখন তার মধ্যে কেবল ১৮ জন মুক্ত আছেন। বাকি সবাই গ্রেপ্তার হয়েছেন বা নিহত।

ছত্তিশগড়ে মাওবাদীরা দুর্বল হয়ে পড়েছে ঠিকই, কিন্তু তারা পাশের রাজ্য মধ্যপ্রদেশে আবার প্রভাব বিস্তার করছে। মাওবাদ হচ্ছে একটি আদর্শ—একে কেবল শক্তি দিয়ে শেষ করা যাবে না। যত দিন না অর্থনৈতিক বৈষম্যহীন সমাজ গড়া যায়, তত দিন এই আদর্শ নতুনরূপে ফিরে আসতে পারে

image_pdfimage_print

সর্বশেষ

সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির সবার মনোনয়নপত্র বৈধ: ইসি

0
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপি জোটের ৩৬টি মনোনয়নপত্রই বৈধ বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি) যাদের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে তারা ২৬ এপ্রিলের মধ্যে আপিল...

তথ্য গোপন করে কেন্দ্র সচিবের দায়িত্ব পালন, চাঁদপুরে প্রধান শিক্ষককে অব্যাহতি

0
জানা গেছে, গত সোমবার ফরাক্কাবাদ ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসাইন চাঁদপুর জেলা প্রশাসকের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়,...

তনু হত্যার ১০ বছর পর প্রথম আসামি গ্রেফতার

0
বুধবার (২২ এপ্রিল) বিকেলে কুমিল্লা সদর আমলি আদালত-১ এর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোমিনুল হক এ রিমান্ডের আদেশ দেন। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) আসামিকে...

পৌনে ২ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি প্রস্তাব অনুমোদন, ব্যয় কত?

0
দেশে জরুরি জ্বালানি চাহিদা পূরণের জন্য ডিবিএস ট্রেডিং হাউস এফজেডসিওর কাছ থেকে ৫০ হাজার মেট্রিক টন ইএন৫৯০-১০ পিপিএম ডিজেল এবং ২৫ হাজার মেট্রিক টন...

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন: প্রথম দফার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রায় দেড় হাজার প্রার্থী

0
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে প্রথম দফার ১৫২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন প্রায় দেড় হাজার প্রার্থী। ২৩ শতাংশের বেশি প্রার্থীর বিরুদ্ধে রয়েছে গুরুতর অপরাধের মামলা। আর...